সংক্ষিপ্ত উত্তর: মুখস্থ বা মোবাইল থেকে কুরআন পড়তে ওযু শর্ত নয়। মোবাইলের স্ক্রিন ছাপানো মুসহাফের হুকুমে পড়ে না বলে অধিকাংশ সমকালীন আলেমের মতে ওযু ছাড়া মোবাইল ধরা যায়, তবে আদব হিসেবে ওযু থাকা উত্তম। জুনুবি (ফরজ গোসল বাকি) অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা যাবে না।
আজকাল আমাদের অনেকেই অফিসে, যাতায়াতে বা বিছানায় শুয়ে মোবাইল অ্যাপে কুরআন পড়ি। তখন প্রশ্ন জাগে: ওযু ছাড়া কি পড়া যাবে? স্ক্রিনে আঙুল দিয়ে পাতা উল্টানো কি কুরআন ছোঁয়ার মতো? চলুন ধাপে ধাপে দেখি।
১. ছাপানো কুরআন (মুসহাফ) ছুঁতে ওযু লাগে কেন?
আল্লাহ তাআলা বলেন: "নিশ্চয়ই এটা সম্মানিত কুরআন, যা সংরক্ষিত কিতাবে আছে, পবিত্র ব্যক্তিরা ছাড়া কেউ তা স্পর্শ করে না।" (সূরা আল-ওয়াকিয়া ৫৬:৭৭-৭৯)। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমর ইবনে হাযম (রা.)-কে যে চিঠি লিখেছিলেন, তাতেও আছে: পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ কুরআন স্পর্শ করবে না (মুয়াত্তা মালিক)। এই কারণে হানাফিসহ চার মাযহাবের অধিকাংশ আলেমের মতে ছাপানো কুরআন ওযু ছাড়া সরাসরি ছোঁয়া যায় না।
২. ওযু ছাড়া কুরআন পড়া যায় কি?
হ্যাঁ। ছোট নাপাকি (ওযু ভেঙে যাওয়া) অবস্থায় মুখস্থ বা না ছুঁয়ে কুরআন পড়া জায়েয, এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে বড় কোনো মতভেদ নেই। তবে ওযু করে পড়া উত্তম ও বেশি আদবপূর্ণ।
৩. মোবাইলের স্ক্রিন কি মুসহাফের মতো?
মোবাইলে কুরআনের লেখা স্থায়ীভাবে লেখা থাকে না; এটা আলো দিয়ে তৈরি সাময়িক ছবি, অ্যাপ বন্ধ করলেই চলে যায়। তাই অধিকাংশ সমকালীন আলেম বলেন, মোবাইল ফোন মুসহাফের হুকুমে পড়ে না, ওযু ছাড়াও মোবাইল ধরা ও স্ক্রিনে স্ক্রল করা যায়।
তবে কিছু আলেম সতর্কতার জন্য বলেন, যখন স্ক্রিনে আয়াত দেখা যাচ্ছে, তখন ওযু ছাড়া সরাসরি লেখার ওপর আঙুল না রাখাই ভালো। মাঝামাঝি নিরাপদ পথ হলো: পাতা উল্টাতে স্ক্রিনের খালি অংশে বা কিনারায় স্পর্শ করুন, আর সম্ভব হলে ওযু করে নিন।
৪. ফরজ গোসল বাকি থাকলে (জুনুবি অবস্থায়)
হানাফি মাযহাবসহ অধিকাংশ আলেমের মতে জুনুবি অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা যাবে না, মোবাইল থেকেও না। তবে দোয়ার নিয়তে কুরআনের দোয়াগুলো (যেমন "রব্বানা আতিনা...") পড়া, জিকির, দরুদ ও ইস্তিগফার করা যাবে।
৫. ঋতুকালীন অবস্থায় মোবাইলে কুরআন
হানাফি মাযহাবে ঋতুকালীন বা নিফাসের সময় কুরআন তিলাওয়াত করা নিষেধ; শুধু দোয়ার নিয়তে কুরআনের দোয়া পড়া, জিকির ও তাসবিহ করা যাবে। মালিকি মাযহাবসহ কিছু আলেম, বিশেষত শিক্ষক বা হাফেজাদের ভুলে যাওয়ার আশঙ্কায়, তিলাওয়াতের অনুমতি দেন। আপনি যে মাযহাব অনুসরণ করেন, সেই অনুযায়ী আমল করুন; প্রয়োজনে আলেমের পরামর্শ নিন। এ সময় মোবাইলে তিলাওয়াত শোনা সবার মতেই জায়েয।
৬. কুরআন অ্যাপ খোলা মোবাইল নিয়ে বাথরুমে যাওয়া
কুরআনের আয়াত স্ক্রিনে খোলা রেখে টয়লেটে ঢোকা আদবের পরিপন্থী, তাই অ্যাপ বন্ধ বা স্ক্রিন অফ করে নিন। অ্যাপ ফোনে ইনস্টল থাকা দোষের কিছু নয়, কারণ বন্ধ অবস্থায় লেখা দেখা যায় না।
৭. মোবাইলে কুরআন পড়ার আদব
- সম্ভব হলে ওযু করে, কিবলামুখী হয়ে পড়ুন
- পড়ার সময় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন
- তিলাওয়াতের মাঝে গান বা অপ্রাসঙ্গিক ভিডিওতে চলে যাবেন না
- শুয়ে বা হেলান দিয়ে পড়া জায়েয, তবে মনোযোগ ধরে রাখুন
সংক্ষেপে প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
ওযু ছাড়া মোবাইলে কুরআন পড়া যাবে কি?
হ্যাঁ, ছোট নাপাকি অবস্থায় না ছুঁয়ে বা মোবাইল থেকে কুরআন পড়া জায়েয। তবে ওযু করে পড়া উত্তম।
ওযু ছাড়া কুরআন অ্যাপ খোলা মোবাইল ধরা যাবে কি?
অধিকাংশ সমকালীন আলেমের মতে মোবাইল মুসহাফের হুকুমে পড়ে না, তাই ধরা যায়। সতর্কতার জন্য আয়াতের লেখার ওপর সরাসরি আঙুল না রাখাই ভালো।
ফরজ গোসল বাকি থাকলে মোবাইলে কুরআন পড়া যাবে কি?
না। হানাফিসহ অধিকাংশ আলেমের মতে জুনুবি অবস্থায় তিলাওয়াত করা যাবে না, তবে জিকির, দরুদ ও দোয়ার নিয়তে কুরআনের দোয়া পড়া যাবে।
ঋতুকালীন অবস্থায় মোবাইলে কুরআন শোনা যাবে কি?
হ্যাঁ, তিলাওয়াত শোনা সবার মতে জায়েয। নিজে তিলাওয়াত করার বিষয়ে মতভেদ আছে; হানাফি মতে নিষেধ।
কুরআন অ্যাপ থাকা মোবাইল নিয়ে বাথরুমে যাওয়া যাবে কি?
অ্যাপ বন্ধ বা স্ক্রিন অফ থাকলে সমস্যা নেই। স্ক্রিনে আয়াত খোলা রেখে ঢোকা আদবের পরিপন্থী।
তথ্যসূত্র
- আল-কুরআন, সূরা আল-ওয়াকিয়া ৫৬:৭৭-৭৯
- মুয়াত্তা মালিক: আমর ইবনে হাযম (রা.)-এর প্রতি রাসূল ﷺ-এর চিঠি
দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য, বাংলাদেশে প্রচলিত হানাফি মাযহাব অনুসারে লেখা। যেখানে অন্য মাযহাবের ভিন্ন মত আছে, তা উল্লেখ করা হয়েছে। আপনার ব্যক্তিগত বিশেষ অবস্থার জন্য একজন নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নিন।
📌 আরো কোনো প্রশ্ন থাকলে Islamic Pro AI-কে জিজ্ঞেস করুন, কুরআন ও হাদিসের রেফারেন্সসহ উত্তর পাবেন। প্রয়োজনীয় ইসলামিক পণ্য পাবেন আমাদের শপে।